বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

মনুস্মৃতি ৯/৩ নিয়ে বিভ্রান্তির জবাব

সাম্প্রতিক সময়ে মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ের ৩ নম্বর শ্লোকটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যায়। শ্লোকটি হলো:
পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্তা রক্ষতি যৌবনে।
রক্ষতি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমহতি॥
(মনুসংহিতা: ৯/৩)
★বঙ্গানুবাদ★ →কৈশোরে বা বাল্যকালে পিতা [কন্যাকে] রক্ষা করেন, যৌবনে স্বামী [স্ত্রীকে] রক্ষা করেন এবং বার্ধক্যে পুত্ররা [মাতা/নারীকে] রক্ষা করেন; কোনো অবস্থাতেই নারী অরক্ষিত বা একাকী পরিত্যাগযোগ্য নয়।

অনেকে এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ বা অপব্যাখ্যা ধরে নিয়ে দাবি করেন যে, শাস্ত্র নাকি নারীকে পরাধীন বা অধিকারহীন করে রেখেছে। কিন্তু গভীরভাবে শ্লোকটির সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে সত্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়।
---
১. 'সুরক্ষার দায়িত্ব', পরাধীনতা নয়
এই শ্লোকে নারীকে কোন বন্দিদশা বা পরাধীনতার কথা বলা হয়নি। এখানে মূলত পুরুষের ওপর বাধ্যতামূলক সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে:
কন্যা অবস্থায়: পিতা তার শিক্ষা, লালন-পালন ও নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব নেবেন।
যৌবনে: স্বামী স্ত্রীর জীবনের সর্বাঙ্গীন নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য সুনিশ্চিত করবেন।
বার্ধক্যে: বৃদ্ধা মাকে একা না ফেলে সন্তানরা (পুত্ররা) তাঁর সেবা ও দেখভালের দায়িত্ব নেবে।
তৎকালীন প্রাচীন যুগে আধুনিক রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বা পুলিশ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে কোনো নারী যেন কখনো অনাথ, একাকী বা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে না থাকে—সেজন্যই পরিবারকে এই সামাজিক সুরক্ষাবলয় (Safety Net) তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
---
২. নারীর নিজস্ব সম্পদ ও আইনি অধিকার (স্ত্রীধন) অনেকে মনে করেন শাস্ত্রে নারীর নিজস্ব কোনো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। অথচ মনুসংহিতাতেই নারীর সম্পত্তি ও নিজস্ব ধনের ওপর একক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে:
-পিতৃমাতৃসুতভ্রাতৃ দত্তং অধ্যুপাগতম্।
-অধ্যাগ্নিকং ঔপায়নিকং স্ত্রীধনং ষড়বিদং স্মৃতম্॥
(মনুসংহিতা: ৯/১৪৮)
★বঙ্গানুবাদ★→পিতা, মাতা, সন্তান ও ভাইয়ের দেওয়া উপহার এবং বিবাহের পর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় প্রাপ্ত সম্পত্তি—ভালোবাসার সূত্রে পাওয়া এই সব উপহার মিলে স্ত্রীধন মোট ছয় প্রকার বলে স্মৃতিশাস্ত্রে গণ্য করা হয়।

ব্যাখ্যা: পিতা, মাতা, স্বামী বা আত্মীয়দের দেওয়া ধন ও উপহার হলো নারীর 'স্ত্রীধন'। মনুসংহিতা ৯/১৪৯ ও ৯/১৯০ শ্লোক অনুযায়ী, এই সম্পদের ওপর স্বামী বা পরিবারের অন্য কোনো পুরুষের কোনো অধিকার নেই। নারী তাঁর এই সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার বা দান করতে পারেন।
---
৩. গৃহ ও সংসারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নারীর একক সিদ্ধান্ত
সংসারের অর্থ জমা রাখা, খরচ করা এবং পরিচালনার চূড়ান্ত দায়িত্ব নারীর ওপরই ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে:
-অর্থস্য সংগ্রহে চৈনং নিয়োগ্যাং চ ব্যয়েন চ।
-শৌচে ধর্মে অন্নপাক্যাং চ পারিনাহ্যস্য বেক্ষণে॥
(মনুসংহিতা: ৯/১১)
★বঙ্গানুবাদ★→ধন-সম্পদ সংগ্রহ ও সঞ্চয়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, গৃহস্থালির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ধর্মীয় কর্তব্য পালন, খাদ্য প্রস্তুত (রান্নাবান্না) এবং গৃহস্থালির যাবতীয় আসবাবপত্র ও তৈজসপত্রের দেখভাল করার কাজে গৃহিণীকে (স্ত্রীকে) নিযুক্ত করা উচিত।

ব্যাখ্যা: গৃহের অর্থ সঞ্চয় ও ব্যয় নির্ধারণ, গৃহের পবিত্রতা রক্ষা, ধর্মকার্য পরিচালনা এবং সংসারের সামগ্রিক তদারকি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতা নারীকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
---
৪. সনাতন শাস্ত্রে নারীর সর্বোচ্চ স্থান
মনুসংহিতায় মাতাকে যে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তা যেকোনো শাস্ত্রের চেয়ে অনুপম:
-উপাধ্যায়ান দশাচার্য আচাৰ্যাণাং শতং পিতা।
-সহস্রং তু পিতৃন মাতা গৌরবেণাতিরিচ্যতে॥"
(মনুসংহিতা: ২/১৪৫)
★বঙ্গানুবাদ★→সম্মান ও গৌরবের বিচারে একজন আচার্য দশ জন উপাধ্যায়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, পিতা ১০০ জন আচার্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং মাতা ১,০০০ জন পিতার চেয়েও অধিক গৌরবময় ও পরম পূজনীয়।

ব্যাখ্যা: একজন আচার্য ১০ জন শিক্ষকের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, পিতা ১০০ জন আচার্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু মা নিজের গৌরব ও মর্যাদায় ১,০০০ পিতার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
---
#অতএব, মনুসংহিতার ৯/৩ শ্লোকটিকে নারীর পরাধীনতার প্রতীক হিসেবে না দেখে, তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি পুরুষের কর্তব্য ও সুরক্ষার অঙ্গীকার হিসেবে দেখাই সঙ্গত। একইসাথে শাস্ত্রে নারীর 'স্ত্রীধন' (নিজস্ব সম্পত্তি), গৃহে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং মাতৃতুল্যের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান করে তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাকে সুদৃঢ় করা হয়েছে।
যেকোনো শ্লোকের একটি অংশ কেটে প্রচার না করে, সামগ্রিক শাস্ত্রে নারীর অবস্থান ও অধিকার অনুধাবন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

Writer and Editor Kanchan Das

মনুস্মৃতি ৯/৩ নিয়ে বিভ্রান্তির জবাব

সাম্প্রতিক সময়ে মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ের ৩ নম্বর শ্লোকটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যায়। শ্লোকটি হলো: পি...