সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব নিয়ে নাস্তিক মত খন্ডন

নাস্তিকের শঙ্কা:- এই মহাবিশ্বের  পরিচালক ও ন্যায়বিচারক কোনো ঈশ্বর যদি থাকতেন, তবে সংসারে হিংসা, চুরি, ব্যভিচার, অন্যায় প্রভৃতি রূপে যে অব্যবস্থা ছড়িয়ে আছে, তা থাকত না। যেহেতু অব্যবস্থা স্পষ্টই দৃশ্যমান হচ্ছে, অতএব এর দ্বারা এটিই সিদ্ধ হয় যে, ঈশ্বর নামক কোনো সত্তা নেই।
________________________________________

★জবাব★ 
--------------বিষয়টি আমরা প্রত্যক্ষই জানি যে, রাজা না থাকলে নগরে ও সমাজে অন্যায়, চুরি, ব্যভিচার, হিংসা, লড়াই ও কলহ-বিবাদের ফলে অব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। রাজা থাকলে এমনটি হয় না। বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকলে শ্রেণিকক্ষে শিশুরা কোলাহল করে, মারামারি করে; শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক উপস্থিত থাকলে তা করে না। ধার্মিক, বিদ্বান ও সভ্য মাতা-পিতা গৃহে না থাকলে বালকেরা পরস্পর বিবাদ করে, বিড়ি-সিগারেট ও মদ্যপান করে, জুয়া খেলে এবং আচারহীন ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে; কিন্তু মাতা-পিতা উপস্থিত থাকলে উপরিউক্ত দুষ্ট কর্মসমূহ করে না। 

সংসারে যে অব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়, তা মনুষ্য কর্তৃক বিস্তারিতে হয়েছে। এর ভিত্তিতে আপনার এই কথা বলা সঙ্গত নয় যে— “সংসারে ঈশ্বরের কোনো সত্তা নেই; যদি ঈশ্বর থাকতেন, তবে এই অব্যবস্থা থাকত না।” কারণ মনুষ্য কর্ম করার ক্ষেত্রে স্বাধীন। আপন অজ্ঞানতা, হঠকারিতা, দুরাগ্রহ, স্বার্থপরতা প্রভৃতি দোষের কারণে সে চুরি, ব্যভিচার, হিংসা, অন্যায় প্রভৃতি দুষ্কর্ম করে থাকে। মনুষ্য যদি কর্ম করার ক্ষেত্রে ঈশ্বরের অধীন (পরতন্ত্র) হতো, তবে সংসারে কোনো অব্যবস্থারূপ কর্ম হতো না। অতএব সংসারে যে অব্যবস্থা দেখা যায়, তার প্রকৃত কারণ হলো ‘মনুষ্যের কর্ম করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা থাকা’—‘ঈশ্বরের সত্তা না থাকলে। 

রাজা থাকলে নগরে চুরি, ব্যভিচার ও হিংসাজন্য অব্যবস্থা থাকত না’—কিন্তু প্রকৃত বিষয় তা নয়। ন্যায়কারী, বলবান, ধার্মিক, বিদ্বান ও আদর্শ রাজার এবং তার প্রণীত সংবিধান ও দণ্ডব্যবস্থার বিদ্যমানতা সত্ত্বেও রাজ্যে মানুষ আপন স্বাধীনতায় চুরি, ব্যভিচার, হিংসা প্রভৃতি কর্ম করে ফেলে। যদিও তারা জানে যে, এই কার্য অনুচিত, সংবিধানবিরুদ্ধ এবং এর প্রতিফলে দণ্ডও ভোগ করতে হবে। এই সব প্রত্যক্ষ দেখা সত্ত্বেও আমরা এই কথা বলি না যে, নগরে রাজা নেই।

ঠিক একই প্রকারে ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী’ এবং ‘মাতা-পিতা ও বালক’ সম্বন্ধে প্রদত্ত দৃষ্টান্তও বোঝা উচিত। সভ্য, বিদ্বান, ধার্মিক গুরুজন তথা মাতা-পিতা শ্রেণিকক্ষে বা গৃহে কেবল অনুপস্থিত থাকলেই যে শিক্ষার্থী বা শিশুরা অব্যবস্থা সৃষ্টি করে তা নয়, বরং গুরুজন ও মাতা-পিতা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তারা অব্যবস্থা সৃষ্টি করে। উচ্চৃঙ্খল ও দুষ্ট শিক্ষার্থী ও বালকেরা তো গুরুজন এবং মাতা-পিতা কর্তৃক বোঝানো, ভয় দেখানো এবং দণ্ড দেওয়ার পরও পরস্পর বিবাদ করে, ভাঙচুর করে, সিগারেট ও মদ্যপান করে, জুয়া খেলে এবং সদাচারহীন কর্মে লিপ্ত হয়। তখন কি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কিংবা গৃহে মাতা-পিতার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায়? এমনটি তো মেনে নেওয়া চলে না।

প্রকৃতপক্ষে সিদ্ধান্ত এটাই যে, প্রত্যেক মনুষ্য কর্ম করার ক্ষেত্রে স্বাধীন। কর্মরত অবস্থায় রাজা, গুরু, মাতা-পিতা কেউ হাত ধরে আটকে রাখতে পারেন না। হ্যাঁ, দুষ্ট কর্ম করার পর দণ্ড প্রদান করেন অথবা সৎকর্ম করার পর পুরস্কারও প্রদান করেন। ঠিক একইরূপ পরিস্থিতি সংসারে ঈশ্বরের বিষয়েও জানা উচিত।

এই সংসারের রাজা ও স্বামী—পরমপিতা ঈশ্বর আছেন। এরকম সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপক, ন্যায়কারী পিতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মনুষ্যরূপ পুত্রগণ আপন স্বাধীনতায় হিংসা, চুরি, ব্যভিচার, অন্যায় প্রভৃতি কর্ম করে থাকে। যদিও বেদের মাধ্যমে ঈশ্বর বিহিত ও নিষিদ্ধ (কর্ত্তব্য ও অকর্ত্তব্য) কর্মের নির্দেশ এই সৃষ্টির আদিতেই প্রদান করেছেন, যা আজ পর্যন্ত আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে। মনুষ্যের হৃদয়ে উপবিষ্ট (অন্তর্যামী) ঈশ্বর ভয়, শঙ্কা ও লজ্জা উৎপন্ন করে পাপকর্ম না করার প্রেরণাও প্রদান করেন। কুকুর, বিড়াল, গাধা, বলদ, শূকর প্রভৃতি দুঃখময় যোনিতে জীবের পাপের ফল ভোগ করতেও প্রত্যক্ষ দেখান। তথাপি মনুষ্য এই সকল বিষয় থাকা সত্ত্বেও আপন স্বাধীনতায় অন্যায় আদি দুষ্ট কার্য করে বসে। ঈশ্বর মনুষ্যকে কর্ম করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ছেড়ে রেখেছেন। কর্ম করার সময় তিনি কারোর হাত চেপে ধরেন না। হ্যাঁ, কর্ম করার পর ন্যায়ানুসারে ফল অবশ্যই প্রদান করেন।

ঈশ্বরের সত্তা তো স্বতঃসিদ্ধই, কারণ তার কার্যে সর্বত্র সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাই পরিলক্ষিত হয়। ঈশ্বরের কার্য হলো—সংসার নির্মাণ করা, পরিচালনা করা, সময় উপস্থিত হলে একে বিনষ্ট করে দেওয়া এবং সকল জীবকে তাদের কর্মের যথাযথ ফল প্রদান করা। ঈশ্বর সূর্য, চন্দ্র প্রভৃতি নির্মাণ করেন। ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কেউ কি এগুলো নির্মাণ করতে পারে? ঈশ্বর এই সূর্য, চন্দ্রকে নির্মাণ করে পরিচালনাও করেন। এই সূর্যাদি পদার্থ কি এক মিনিটের জন্যও চলতে চলতে থেমে গেছে? ঈশ্বরের কার্য হলো বীজ নির্মাণ করা এবং বীজ হতে বনস্পতি (উদ্ভিদ) নির্মাণ করা। আম হতে আম হয়, কলা হতে কলা, গম হতে গম এবং ছোলা হতে ছোলা উৎপন্ন হয়। ঠিক তেমনই ঈশ্বর মনুষ্যাদি প্রাণীর শরীর নির্মাণ করেন। মনুষ্য হতে মনুষ্য এবং পশু হতে পশুর শরীর নির্মিত হয়। এই সকল

কার্যে কি কখনো কোনো রদবদল বা অব্যবস্থা ঘটে? ঠিক একই প্রকারে সংসারকে বিনষ্ট (প্রলয়) করাও ঈশ্বরেরই কার্য। এমন এক সময় আসবে, যখন সূর্যের উত্তাপ সমাপ্ত হয়ে যাবে, পৃথিবীতে উৎপাদন শক্তি অবশিষ্ট থাকবে না, তখন সংসার মনুষ্যাদি প্রাণীর বসবাসের উপযোগী থাকবে না। সেই অবস্থায় ঈশ্বর একে বিনষ্ট করে দেবেন। জীবের আপন শুভ-অশুভ কর্মের অনুরূপ প্রাপ্ত মনুষ্য, পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ প্রভৃতি বিভিন্ন যোনি ঈশ্বরের ন্যায়বিচারকেই সিদ্ধ করছে। অতএব ঈশ্বরের কার্যে সর্বত্র শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাই পরিলক্ষিত হয়।

ঈশ্বরের কার্যক্ষেত্র পৃথক এবং জীবের কার্যক্ষেত্র পৃথক। ‘ঈশ্বরের কার্য জীব করতে পারে না এবং জীবের কার্য ঈশ্বর করেন না’—এই সিদ্ধান্তের আলোচনা আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে করে এসেছি। অতএব রাজা কর্তৃক সংবিধান প্রবর্তিত হওয়া সত্ত্বেও নাগরিকগণ যদি আপন স্বাধীনতায় অনুচিত কার্য করে ফেলে, তবে তার দ্বারা রাজার সত্তা অস্বীকৃত হয় না। ঠিক তেমনই ঈশ্বর কর্তৃক ‘বেদ’-রূপী সংবিধান প্রদত্ত হওয়া সত্ত্বেও এবং মনে ভয়, শঙ্কা ও লজ্জা উৎপন্ন করা সত্ত্বেও মনুষ্যগণ যদি আপন স্বাধীনতায় সংসারে চুরি, ব্যভিচার, ছলনা, কপটতা, অন্যায় প্রভৃতি করে অব্যবস্থা ছড়ায়, তবে তার দ্বারা ঈশ্বরের সত্তাকে অস্বীকার করা যায় না।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব নিয়ে নাস্তিক মত খন্ডন

নাস্তিকের শঙ্কা:- এই মহাবিশ্বের  পরিচালক ও ন্যায়বিচারক কোনো ঈশ্বর যদি থাকতেন, তবে সংসারে হিংসা, চুরি, ব্যভিচার, অন্যায় প্রভৃতি রূপে যে অব্য...